কিছু কিছু রাত আসে
যখন পৃথিবী খুব বেশি শব্দ করে,
আর আমার আত্মা
আর কিছু বোঝাতে চায় না।
প্রশ্নেরা ঘুরে বেড়ায় নিঃশব্দে,
বিশ্বাস কাঁপে,
আশা যেন ক্ষীণ এক প্রদীপ,
অদৃশ্য বাতাসে দুলতে থাকে।
তখন আমি অন্ধকারকে অনুভব করি,
শত্রু হিসেবে নয়,
বরং এক গভীর নীরবতা হিসেবে,
যে আমাকে বলে,
শোনো।
আর আমার হৃদয়ের ভেতর
একটি বাক্য ধীরে জ্বলে ওঠে,
অন্ধকারে আমার সঙ্গী।
কারণ অন্ধকার ফাঁকা নয়।
সে পরিত্যক্ত নয়।
সে প্রমাণ নয় যে আমি ভুলে গেছি।
অন্ধকারই সেই স্থান
যেখানে সৃষ্টিকর্তা সবচেয়ে কাছে আসেন।
যখন সব বিভ্রান্তি থেমে যায়,
যখন পৃথিবীর টান ঢিলে হয়ে পড়ে,
যখন নিশ্চিত সব উত্তর ভেঙে যায়,
ঠিক তখনই উপস্থিতি জন্ম নেয়।
কোনো শব্দে নয়,
কোনো বজ্রে নয়,
বরং নিঃশ্বাসের মতো,
যে নিঃশ্বাস আমরা ভুলে গিয়েছিলাম নিতে।
এই সময়গুলোতে আমরা সবাই
কিছুটা হারিয়ে যাই।
পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়ে,
ভয় ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত,
সত্যকে ঢেকে দেয় কোলাহল।
মানবতা দাঁড়িয়ে থাকে
এক সন্ধিক্ষণে,
ক্লান্ত, বিভক্ত,
কিন্তু গভীরভাবে কিছু সত্যের জন্য তৃষ্ণার্ত।
তবুও,
আমার সঙ্গী থাকেন।
অশান্তির মধ্য দিয়ে হাঁটেন আমার পাশে,
অব্যক্ত কান্নার পাশে,
অউত্তরিত দোয়ার পাশে।
অনেকে একে অন্ধকার বলে।
অনেকে বলে পতন।
কিন্তু হয়তো
এটাই এক পবিত্র গর্ভ
যেখানে নতুন আলো জন্ম নেবার আগে
পুরনো আবরণ খুলে যেতে হয়।
আমি অনুভব করি এখন,
ভয়ের নিচে এক নীরব আন্দোলন,
আত্মার গভীরে এক কোমল চাপ,
যেন আকাশ নিজেই ঝুঁকে আসছে।
পবিত্র শক্তি নেমে আসে,
ভয় দেখাতে নয়,
বরং জাগাতে।
ভাঙা হৃদয়ে,
ক্লান্ত মনে,
আর তাদের কাছে
যারা অজানার পাশে বসে থাকতে পারে।
সবাই টের পায় না।
কেউ নীরবতা থেকে পালায়।
কেউ শব্দে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে।
কিন্তু সাধক থামে।
অন্বেষী অপেক্ষা করে।
আহত আত্মা শোনে।
আর হঠাৎ,
অন্ধকার বদলে যায়।
যা একসময় দূরত্ব ছিল,
তা হয়ে ওঠে নৈকট্য।
যা পরিত্যাগ মনে হয়েছিল,
তা হয়ে ওঠে আলিঙ্গন।
বিচ্ছেদের যে গভীর খাদ,
তা আর ফাঁক নয়,
তা এক সেতু।
তখন আমি বুঝি,
আমি কখনো একা ছিলাম না।
প্রতিটি কষ্টের ধাপে,
প্রতিটি বিভ্রান্ত মুহূর্তে,
নীরব প্রার্থনার প্রতিটি কম্পনে,
এক সঙ্গী ছিল।
যিনি চলে যান না।
যাঁর আলো বিশ্বাস দাবি করে না
শুধু হৃদয় খুলে দিতে বলে।
অন্ধকারে আমার সঙ্গী।
তাই এখন আমি রাতকে অভিশাপ দিই না।
আমি তার পাশে বসি।
আমি তার সঙ্গে নিঃশ্বাস নিই।
কারণ আমি জানি,
এই মুহূর্তেও,
বিশেষ করে এই মুহূর্তেই,
কিছু পবিত্র জন্ম নিচ্ছে।
অন্ধকার শেষ নয়।
এটি সেই মিলনের স্থান
যেখানে মানুষের হৃদয়
চিরন্তনের সঙ্গে মিলে যায়।
আর সেই নীরব সংযোগে
আমি আবার নিজেকে খুঁজে পাই।